বড় পোস্ট এলার্ট! বিশ্ব-রাজনীতি নিয়ে যারা ইন্টারেস্টেড তাদের জন্য!
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি শুরু হয়ে গেছে? নাকি এখন
যুদ্ধের প্রাককালীন অবস্থা চলছে? শুরু হলেও বা
কিভাবে? সব তো ঠিকঠাকই চলছে। তাহলে???
এই পোস্টটি পড়ার পরে আশা করি সবাই একটু
হলেও ধারণা পাবেন। কিন্তু, সেজন্যে
আমাদের জানতে হবে কিভাবে একটা
বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। আসুন, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
আলোকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কিত এসব প্রশ্নগুলো
একটু ভেবে দেখি। কারণ,আমাদের উচিত
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ:
মাত্র ১৮৭১ সালে জার্মানী একটি রাষ্ট্র
হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবুও তৎকালীন
সাম্রাজ্যবাদের যুগে ১৮৯৮ এ এসেই তাদের
উচ্চাকাঙ্খী সম্রাট, কাইজার দ্বিতীয়
উইলহেইমের মনে ইউরোপের বাইরেও সাম্রাজ্য
স্থাপনের খায়েশ জাগে। অবশ্য জার্মান
অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তি সেই স্বপ্ন
দেখার মত অবস্থানে ছিলও।
অপরদিকে রাশিয়ার সম্রাট দ্বিতীয়
নিকোলাসও ক্ষয়িষ্ণু অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান
সাম্রাজ্যের এলাকায় নিজ প্রভাব বিস্তারের
দিকে নজর ছিল, এবং ঘরোয়া সমস্যা মানে
তৎকালীন কম্যুনিস্ট বিপ্লব থেকে জনগণের নজর
ফেরানোর জন্য এবং ক্ষমতা নিশ্চিতের জন্য
একটি যুদ্ধজয় খুব ইতিবাচক মনে করে। এছাড়াও
অস্ট্রিয়ার সুত্র ধরে সার্বিয়ায় জার্মান
উপস্থিতি রাশিয়া একটি নিশ্চিত হুমকি স্বরূপ
দেখে!
ভৌগলিকভাবে ইউরোপের বাইরে অবস্থিত
একটি দ্বীপরাষ্ট্র ব্রিটেন , প্রচন্ড শক্তিশালী
নৌ-শক্তির অধিকারী সাম্রাজ্যটা এবং নৌ-
সামরিক শক্তি দ্বারা তৎকালীন সময়ের
অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে একক আধিপত্য
বিস্তার করে রেখেছিল এবং বিশ্বজুড়ে
ছড়িয়ে থাকা এর কলোনিগুলোর সাহায্যে
তৎকালীন বিশ্বে ব্রিটেন ছিল একক পরাশক্তি।
জার্মান উত্থান ছিল তার চোখে নিজ শক্তির
প্রতি হুমকি! এবং জার্মান দৃষ্টি ছিল
ব্রিটেনকে চ্যালেঞ্জ করা!
অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরী ও অটোমান সাম্রাজ্য
২টি অতীতে প্রচন্ড শক্তিশালী কিন্তু সেইসময়
পতনের মুখে থাকা শক্তি, জার্মানীর
সাহায্যে তাদের হারানো ক্ষমতা ফিরে
পাবার স্বপ্ন ছিলই।
ফ্রান্স তখন, আফ্রিকার কলোনী থেকে প্রাপ্ত
সম্পদের কারনে বেশ ভাল কন্ডিশনে থাকলেও
একটি শক্তিশালী জার্মানী মানেই তাদের
ভয়াবহ ক্ষতি।
এমন অবস্থায়, ১৯১৪ সালে অস্ট্রো-হাঙ্গের
ীয়ান সাম্রাজ্যের হবু সম্রাট, ডিউক
ফার্ডিনান্ড সিংহাসনে আরোহনের কিছুদিন
আগে সারায়েভো শহরে স্ত্রী সহ সার্বিয়ান
বিচ্ছিন্নতাবাদী আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়!
( এটাকে দুনিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে
তাৎপর্যপূর্ণ হত্যা অথবা সবচেয়ে ভুল হত্যাকান্ড
বললে ভুল হবে না! )
এর ফলে সিংহাসন বসা নিয়ে অস্ট্রো-
হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্য মুশকিলে পড়ে, এবং
সার্বিয়ার উপর যার পর নাই ক্ষুদ্ধ হয়। সার্বিয়া
একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কিন্তু অস্ট্রিয়া
একটি নিদৃষ্ট সময় বেঁধে দেয় প্রতিবেদন পেশ
করার জন্য এবং বিচারের কিছু শর্ত বেঁধে
দিয়ে তদন্ত কমিটিতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান
সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি নিয়োগের দাবী
জানায়। কিন্তু সার্বিয়া এর সব শর্ত মানতে
অস্বীকার করে।
তখন জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় উইলহেইম
অস্ট্রিয়াকে সম্পুর্ন সমর্থন দেবার ঘোষনা দেয়
এবং অস্ট্রিয়ান দাবীর সাথে সহমত পোষন
করে।আক্রমানাত্মক পদক্ষেপ নেবার জন্য
জার্মান সমর্থন অস্ট্রিয়ার জন্য ব্যাপক
প্রয়োজনীয় ছিল, কিন্তু জার্মানী-অস্ট্রিয়ার
এই যৌথ শক্তি'র উত্থানের বিপক্ষে জার্মানীর
২ প্রতিবেশী ফ্রান্স এবং রাশিয়া সার্বিয়ার
পেছনে এসে দাড়ায়।
এবং অস্ট্রিয়ার দ্বারা সার্বিয়া আক্রমনের
পরপর ভিন্ন ভিন্ন চুক্তি অনুসারে জার্মানী-
অস্ট্রিয়ার সাথে ফ্রান্স- রাশিয়া যুদ্ধে
জড়িয়ে পড়ে।
এবং অন্য একটি জার্মান-অটোমান চুক্তি
অনুযায়ী রাশিয়া যুদ্ধে যোগ দিলে অটোমান
সাম্রাজ্য জার্মানীর পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়ার
কথা ছিল, তাই অটোমান সাম্রাজ্যও যুদ্ধে যোগ
দেয়!
জার্মানী নিরপেক্ষ বেলজিয়াম আক্রমন করলে
তখন পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটেন জার্মানীর
বিপক্ষে যুদ্ধে ঘোষনা করে! ১৯১৭ সালে
রাশিয়ায় বলশেভিক ( কম্যুনিস্ট) বিপ্লবের ফলে
রাশিয়া যুদ্ধ ত্যাগ করে।আবার, মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং ভৌগলিক ও
সামরিক শক্তি ব্যাপক থাকলেও তাদের নীতি
ছিল (যেমন ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও)
যেকোন ইউরোপীয়ান ঝামেলার বাইরে
থাকা।
কিন্তু ফ্রান্স-ব্রিটেনকে রসদ যোগান দেয়ার
অভিযোগে জার্মান সাবমেরিন যখন ৭টি
যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ ডুবিয়ে দেয় তখন
যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত যুদ্ধে যোগ দিয়ে এটাকে
বিশ্বযুদ্ধ রূপ দেয়! এবং মুলত এরপরই জার্মান পরাজয়
নিশ্চিত হয়!
.
.
.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধঃ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানীকে ২৬৯
বিলিয়ন "গোল্ড মার্ক" জরিমানা করা হয় এবং
১৮৭২ এর যুদ্ধে জার্মান দখলকৃত "আলসাক-লরেন"
এলাকা ফ্রান্স নিয়ে নেয়! জার্মানীকে
অস্ত্রহীন করে ফেলা হয়। এবং অস্ট্রো-হাঙ্গের
ীয়ান সাম্রাজ্যকে একদম খন্ড খন্ড করে ফেলা
হয়।
অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তর আফ্রিকা এবং
মধ্যপ্রাচ্য বেদখল করা হয় এবং তুরস্কের নানা
অংশ দখল করার লক্ষ্যে ব্রিটেন-ফ্রান্স-ইটালী-
গ্রিস তুর্কী ভুখন্ডে ঢুকে যায় ( যদিও কামাল
আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্ক নিজেদের ভুমি
রক্ষা করতে সক্ষম হয় )।
সবচেয়ে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে , যুদ্ধ পরবর্তী
মূল নেতা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসনের
সাথে! মার্কিন নেতৃত্বে পুরো দুনিয়া বদলে
দেবার স্বপ্ন দেখিয়ে ইউরোপ থেকে দেশে
ফেরার পর মার্কিন কংগ্রেস উইলসনের সমস্ত
প্ল্যান খারিজ করে দেয়, এবং নিজেদের
ইউরোপীয়ান ঝামেলা থেকে দুরে রাখার
সিদ্ধান্ত নেয়!!!!! ( যেটা নতুন বিশ্ব ব্যাবস্থা
সফল করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে যায় )
এই অবস্থায়, ১০ বছর পেরিয়ে যায়। তখনো বিশ্ব
জুড়ে ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চ সাম্রাজ্য ছিল এবং
নিদৃষ্ট যোগ্য কোন নেতৃত্ব না থাকায় দেশগুলো
নব্য লিবেরাল আইডিয়া ঠিক মত আত্মস্থ করতে
ব্যার্থ হওয়ায়, ফলে "লীগ অব নেশন" কার্যত কাজ
করতে পারছিল না! এবং রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ
স্বার্থ রক্ষা করার নীতি এবং সামগ্রিক
চিন্তার অভাবে ধীরে ধীরে এটা পুরোপুরি
অকার্যকর হয়ে পড়ে
এই অবস্থায়, বিজয়ী ব্রিটেন বা ফ্রান্স
আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রনে অনাগ্রহী
হয়ে নিজ নিজ হিসাব ঠিক রাখায় ব্যাস্ত হয়ে
পড়ে। ফ্রান্সের লক্ষ্যে ছিল জার্মানীর
ভবিষ্যত যুদ্ধ করার ক্ষমতা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্হ করে
ফেলতে, কিন্তু ব্রিটেন হয়তো "নেপোলিয়ান"
যুগের কথা স্বরন করে "ব্যালেন্স অব পাওয়ার"
ঠিক রাখার জন্যই জার্মানীর সামরিক
উপস্থিতির সমর্থন করে! এবং জার্মানী আবার
নিজেদের সামরিক বাহিনী গঠনের অনুমুতি
পায়! ( এটা একটা মহা গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ
ঘটনা, কারন ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানীর
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ
উন্মুক্ত হয় এর দ্বারাই)
এরই মাঝে বিশ্বজুড়ে দেখা দেয় "অর্থনৈতিক
মহামন্দা" ( বর্তমান সময়ের মতই অবস্থা! ) করুন
অর্থনৈতিক পরিবেশে ইটালীতে ফ্যাসিস্ট
মুসলিনির আবির্ভাব ঘটে এবং জার্মানীতে
নির্বাচিত হয়ে যায় এডলফ হিটলার!!!
অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলায় সব দেশই নিজ নিজ
স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল এবং
চিরসত্য হলো, সামাজিক-অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খল
পরিবেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির চেয়ে
স্বৈরাচারী শাষন বেশী কার্যকর। তাই ফ্রান্স-
ব্রিটেনের তুলনায় জার্মানী-ইটালী'র
অর্থনীতি দ্রুত সংগঠিত হচ্ছিল!
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম পক্ষ, তুর্কী এইবার
নিজেদের বেশ কৌশলে যুদ্ধ থেকে দুরে
রাখে। যদিও তুর্কি জনগণ জার্মানদের প্রতি
সহানুভুতিশীল ছিল, কিন্তু তুর্কি সরকার মিত্র
বাহিনীর সাথে মিত্রতা রক্ষা করে চলে
পুরো সময়জুড়ে!
এবং এশিয়ার শক্তি জাপানও যখন ফ্যাসিস্ট
নীতি গ্রহন করে তখন, জার্মানী-ইটালী ও
জাপান ৩টি দেশ মিলে সারা বিশ্বে
তৎকালীন আর্থ-সামাজিক ব্যাবস্থা বদলে
"জাতিভিত্তিক" নতুন ব্যাবস্থা প্রণোয়নের
পরিকল্পনা গ্রহন করে।
এবং সেই লক্ষে কাজ করা শুরু করে দেয় শীঘ্রই।
পরবর্তী ইতিহাস বেশ সহজ!
ফ্যাসিস্ট ইটালি এবং জার্মানীর সাথে প্রথম
বিশ্বযুদ্ধে আংশিক জয়ী জাপানও সামরিক
বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধি পেয়ে ফ্যাসিস্ট
রিজিম কায়েম হয়!
এবং এই ৩ দেশ তৎকালীন আন্তর্জাতিক
রাজনৈতিক ধারা পরিবর্তনের পরিকল্পনা
করে। ওদের দাবী ছিল, তৎকালীন ব্যাবস্থা
সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন এবং ফ্রান্সেরই
সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করছে, অন্যদের
ঠকাচ্ছে ঐ ব্যাবস্থা!
প্রথম আগ্রাসী হয় জাপান, ১৯৩১ সালে চীনের
মাঞ্চুরিয়া, ১৯৩৭ সালে চীনের মুল ভুখন্ড দখল
করে।
ইটালী ১৯৩৫ সালে আবিসিনিয়া এবং ১৯৩৯
আলবানিয়া দখল করে।
এবার এ্যাকশন শুরু করে হিটলার! তারও স্বপ্ন ছিল
তৎকালীন বিশ্বব্যাবস্থা বদলে দিয়ে একটি
জাতিভিত্তিক ব্যাবস্থা প্রনোয়ন করা। তার
মতে তৎকালীন ব্যাবস্থা বদলে জার্মান
জাতির সন্মান পুনরুদ্ধার এবং শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত
করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়!
১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়াকে জার্মানীর সাথে
একীভুত করা হয়। ( যদিও অস্ট্রিয়ানরা বলে
হিটলার এমনটা জোর করে করেছিল , কিন্তু
আমার মনে হয় ঘটনা ভিন্ন )
১৯৩৯ সালে চেকোস্লোভাকিয়ায় বসবাসরত
জার্মানদের নিরাপত্তার অজুহাতে
চেকোস্লোভাকিয়া দখল করে ফেলে!
ব্রিটেন এবং ফ্রান্স ততদিনে ভবিষ্যৎ নিয়ে
চিন্তিত হতে শুরু করেছে। কিন্তু জার্মান
শক্তির কথা মাথায় রেখে ধৈর্য্য ধরে
পর্যবেক্ষন করে যাচ্ছিল এবং নাৎসিদের চেক
দখল পর্যন্ত মেনে নিয়েছিল।
কিন্তু নাৎসীদের পরবর্তী সম্ভাব্য শিকার
পোল্যান্ডের উপর নজর রাখছিল! ২৩ আগস্ট ১৯৩৯
সালে দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়ে নাৎসি
হিটলারের সাথে রাশিয়ার কম্যুনিস্ট নেতা
স্ট্যালিন একটি অনাগ্রাসন চুক্তি সম্পন্ন করে!
রাশিয়ার সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যাবার পর ব্রিটেন
এবং ফ্রান্স এখন কিছুই করার ক্ষমতা রাখে না
চিন্তা করে জার্মানী একসপ্তাহ পরই ১লা
সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমন করে!
কিন্তু নাৎসীদের অবাক করে দিয়ে,
পোলিশদের পাশে দাড়ায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স
এবং তারা জার্মানীর বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষনা
করে দেয়!
হিটলার দ্রুতই প্রচন্ড শক্তিশালী জার্মান
সেনাবাহিনীকে বলকান অঞ্চল, উত্তর
আফ্রিকা এবং পশ্চিম ইউরোপ অভিমুখে যাত্রা
করায়। তারা নরওয়ে, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম,
লুক্সেমবার্গ, হল্যান্ড দখল করে নেয়। ফ্রেঞ্চ-
ব্রিটিশ সব প্রতিরোধ উড়ে যায়! ১৯৪০ সালেই
জুলাই মাসের মধ্যে প্যারিস পর্যন্ত দখল করে
ফেলে নাৎসি জার্মানী! এবং ব্রিটেনের
উপর ভয়াবহ বিমান হামলা চালায়!
এরপরই ঘটে অদ্ভুদ সেই ভুল! কোন এক অজানা
কারনে ব্রিটেন সম্পুর্ণ দখল না করেই সদ্য মিত্র
রাশিয়া আক্রমন করে বসে! ( একই ভুল প্রথম
বিশ্বযুদ্ধে করেছিল করেছিল জার্মান কাইজার
দ্বিতীয় উইলহেইম )
এরপর অপেক্ষা করছিল তারচেয়ে বড় ভুল! জাপান
পার্ল হার্বারে তখন পর্যন্ত যুদ্ধের বাইরে
থাকা মার্কিন ঘাটি আক্রমন করে বসে!
( একই ভুল এর আগে করেছিল জার্মানি মার্কিন
জাহাজ ডুবিয়ে)
এবং একই সময়ে জার্মানীও যুক্তরাষ্ট্রের
বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষনা করে!
জাপানী আক্রমন এবং জার্মান যুদ্ধ ঘোষনার
প্রেক্ষিতে একঘরে নীতি বাদ দিয়ে মার্কিন
প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট ব্রিটেন ও
সোভিয়েত বাহিনীর সাথে মিত্রতা করে
যুদ্ধে যোগ দেয়!
এরপর আরো ৪ বছর জার্মানী চতুর্দিকে ছড়িয়ে
পড়া ফ্রন্টে যুদ্ধ করে যায় এবং কনসান্ট্রেশন
ক্যাম্পে ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ হত্যা করে!
রাশিয়ায় ব্যাপক সৈন্য হারিয়ে এবং মিত্র
বাহিনীর বিমানহামলায় জার্মানীর অভ্যন্তর
বিদ্ধস্ত হয়ে ব্যাপক শক্তি হারিয়ে এক পর্যায়ে
১৯৪৫ সালে আত্মসমর্পন করে!
এরপর পরাজয়ের দাড়প্রান্তে দাড়িয়ে থাকা
জাপান সাধ্যমত লড়ে যাচ্ছিল কিন্তু
জার্মানীর আত্মসমর্পনের ৩ মাস পর হিরোশিমা
ও নাগাসাকির ২ টা এ্যাটম বোমার বিস্ফোরন
তাদেরও আত্মসমার্পন তড়ান্বিত করে!
.
এই দুইটা বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস ঘেটে আমরা
নিম্নে উল্লিখিত কিছু ধারণা পাই।
১। প্রতিটা বিশ্বযুদ্ধ শুরু করার জন্যেই পিছনেই
কারণ হচ্ছে বিশ্বের একচ্ছত্র আধিপত্য হস্তগত
করা।
২। প্রতিটা বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে
'বাইলেটারাল ওয়ার' হিসেবে আত্নপ্রকাশ
করে। কিন্তু, পরবর্তীতে সেটা 'চেইন অব ওয়ার'
এ পরিণত হয়। অর্থাৎ, এক দেশ আরেকদেশের
সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ থাকা অবস্থায় কোন
একটা দেশ আক্রমণের শিকার হয়, ফলে অপর দেশ
অনাকাংখিতভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ঠিক
যেমন, কান টানলে মাথা আসে।
৩। প্রতিটা বিশ্বযুদ্ধই প্রথম দিকে বড় শক্তিধর
দেশগুলো কর্তৃক ছোট ছোট কিন্তু সম্পদশালী
দেশগুলোতে আক্রমণ ও দখলের ঘটনা আছে। কিন্তু,
সেখান থেকে চেইন অব ওয়ার এর কারণে অপর
দেশের অংশগ্রহণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। যার
ফলে যুদ্ধের সীমানা বাড়তে বাড়তে
বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়।
তাহলে আমরা বলতে পারি, একটা বিশ্বযুদ্ধ
সৃষ্টির পর্যায় (period) কিংবা, ধাপ (Step) চারটি।
যথা:-
ধাপ ১। বিশ্বজুড়ে একাধিক দেশের একচ্ছত্র
আধিপত্য বিস্তার করার আকাংক্ষা ও সেই
লক্ষ্যে শক্তি অর্জন।
ধাপ ২।অর্জিত শক্তি প্রদর্শনের জন্য কোন এক বা
একাধিক দেশ আক্রমণ করা
ধাপ ৩। অপর আধিপত্যবাদী শক্তি কর্তৃক প্রতি
আক্রমণ।(হয় অপর শক্তির উথানের শংকায় অথবা,
চেইন অব ওয়ার এর কারণে)
ধাপ ৪। আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ 'চেইন অব ওয়ার' এর
মাধ্যমে বাড়তে থাকা ও সমগ্র বিশ্বে (প্রায়)
ছড়িয়ে পড়া।
বলা বাহুল্য যে, আমরা কেবল চতুর্থ ধাপেই বুঝতে
পারি যে, একটা বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। (কিন্তু
ইসলামিক এস্কাটলজির ছাত্ররা এর আগেই বুঝে
যাব ইনশাআল্লাহ)।
এখন, এই কন্ডিশনগুলোর আলোকে আলোচনা করব
আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোন ধাপে আছি।
.
আমরা দেখতে পাচ্ছি,
১ম ধাপঃআমেরিকা বিশ্বে একক আধিপত্য
বিস্তার করতে চাচ্ছে। তার প্রকাশ্য বাধা
রাশিয়া। আবার, রাশিয়াও বিশ্বে একক
আধিপত্য বিস্তারের স্বপ্ন দেখে। আর, তার
প্রকাশ্য বাধা আমেরিকা। অপরদিকে, ইসরাইলও
বিশ্বে একক আধিপত্য বিস্তার করতে চাচ্ছে।
কিছুটা অন্য কায়দায়।
২য় ধাপঃ ছোট ছোট কিন্তু সম্পদশালী দেশ
আক্রমণ ও দখল নেয়া।আমরা দেখতে পাচ্ছি,
আমেরিকা তেলসমৃদ্ধ ইরাক ও আফগানিস্তান
দখল করেছে।
৩য় ধাপঃ আমেরিকার পরবর্তী শিকার ছিল
ইউক্রেন (যাতে রাশিয়াকে কোনঠাসা করা
যায়)। কিন্তু, বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে
রাশিয়া ইউক্রেনের (ক্রিমিয়া) দখল অর্জন
করে। আমেরিকার পরবর্তী প্রচেষ্টা সিরিয়া
দখল করা। কিন্তু, সেখানে তার প্রধান প্রতিপক্ষ
এখন রাশিয়া।এখন, রাশিয়া ও আমেরিকা দুই
গ্রুপই সিরিয়ার দখল নিয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে
যাচ্ছে।
এই তিনটি ধাপ সম্পন্ন হয়ে গেছ)
৪র্থ ধাপঃ এই ধাপ নিয়ে সবাই একমত নাও হতে
পারেন (আমি নিজেও জানি না আমার
ভবিষ্যত ধারণা সঠিক হবে কি না। যেটা
একমাত্র আল্লাহই জানেন)। তবু বলছি, একটু মনযোগ
দিয়ে খেয়াল করুন। হাদিসের মাধ্যমে আমরা
পূর্বাভাস পাই যে, মালহামা শুরু হবে সিরিয়া
থেকে (ফোরাত উপকূল থেকে)। সাম্প্রতিক তথ্য
অনুযায়ী, সিরিয়া তে তুরস্ক অভিযান
পরিচালনা করছে। কিন্তু, সিরিয়ার সাথে
তুরস্কের কুটনৈতিক সম্পর্ক কিন্তু ভালো নয়। তাই,
তুরস্কের এই পদক্ষেপের ফলে যেকোন সময় তুরস্ক-
সিরিয়া যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। যার ফল হবে
মালহামা বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কারণ, তুরস্ক হচ্ছে
ন্যাটোর সদস্য। অন্যদিকে, সিরিয়া হচ্ছে
'সিরিয়া-ইরান-রাশিয়া এলায়েন্স' এর সদস্য।
কাজেই এই দুয়ের মধ্যকার যুদ্ধ চেইন অব ওয়ার এর
মাধ্যমে দিতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের
আনুষ্ঠানিক রূপ।(আল্লাহ ভালো জানেন)
যুদ্ধের প্রাককালীন অবস্থা চলছে? শুরু হলেও বা
কিভাবে? সব তো ঠিকঠাকই চলছে। তাহলে???
এই পোস্টটি পড়ার পরে আশা করি সবাই একটু
হলেও ধারণা পাবেন। কিন্তু, সেজন্যে
আমাদের জানতে হবে কিভাবে একটা
বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। আসুন, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
আলোকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কিত এসব প্রশ্নগুলো
একটু ভেবে দেখি। কারণ,আমাদের উচিত
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ:
মাত্র ১৮৭১ সালে জার্মানী একটি রাষ্ট্র
হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবুও তৎকালীন
সাম্রাজ্যবাদের যুগে ১৮৯৮ এ এসেই তাদের
উচ্চাকাঙ্খী সম্রাট, কাইজার দ্বিতীয়
উইলহেইমের মনে ইউরোপের বাইরেও সাম্রাজ্য
স্থাপনের খায়েশ জাগে। অবশ্য জার্মান
অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তি সেই স্বপ্ন
দেখার মত অবস্থানে ছিলও।
অপরদিকে রাশিয়ার সম্রাট দ্বিতীয়
নিকোলাসও ক্ষয়িষ্ণু অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান
সাম্রাজ্যের এলাকায় নিজ প্রভাব বিস্তারের
দিকে নজর ছিল, এবং ঘরোয়া সমস্যা মানে
তৎকালীন কম্যুনিস্ট বিপ্লব থেকে জনগণের নজর
ফেরানোর জন্য এবং ক্ষমতা নিশ্চিতের জন্য
একটি যুদ্ধজয় খুব ইতিবাচক মনে করে। এছাড়াও
অস্ট্রিয়ার সুত্র ধরে সার্বিয়ায় জার্মান
উপস্থিতি রাশিয়া একটি নিশ্চিত হুমকি স্বরূপ
দেখে!
ভৌগলিকভাবে ইউরোপের বাইরে অবস্থিত
একটি দ্বীপরাষ্ট্র ব্রিটেন , প্রচন্ড শক্তিশালী
নৌ-শক্তির অধিকারী সাম্রাজ্যটা এবং নৌ-
সামরিক শক্তি দ্বারা তৎকালীন সময়ের
অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে একক আধিপত্য
বিস্তার করে রেখেছিল এবং বিশ্বজুড়ে
ছড়িয়ে থাকা এর কলোনিগুলোর সাহায্যে
তৎকালীন বিশ্বে ব্রিটেন ছিল একক পরাশক্তি।
জার্মান উত্থান ছিল তার চোখে নিজ শক্তির
প্রতি হুমকি! এবং জার্মান দৃষ্টি ছিল
ব্রিটেনকে চ্যালেঞ্জ করা!
অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরী ও অটোমান সাম্রাজ্য
২টি অতীতে প্রচন্ড শক্তিশালী কিন্তু সেইসময়
পতনের মুখে থাকা শক্তি, জার্মানীর
সাহায্যে তাদের হারানো ক্ষমতা ফিরে
পাবার স্বপ্ন ছিলই।
ফ্রান্স তখন, আফ্রিকার কলোনী থেকে প্রাপ্ত
সম্পদের কারনে বেশ ভাল কন্ডিশনে থাকলেও
একটি শক্তিশালী জার্মানী মানেই তাদের
ভয়াবহ ক্ষতি।
এমন অবস্থায়, ১৯১৪ সালে অস্ট্রো-হাঙ্গের
ীয়ান সাম্রাজ্যের হবু সম্রাট, ডিউক
ফার্ডিনান্ড সিংহাসনে আরোহনের কিছুদিন
আগে সারায়েভো শহরে স্ত্রী সহ সার্বিয়ান
বিচ্ছিন্নতাবাদী আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়!
( এটাকে দুনিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে
তাৎপর্যপূর্ণ হত্যা অথবা সবচেয়ে ভুল হত্যাকান্ড
বললে ভুল হবে না! )
এর ফলে সিংহাসন বসা নিয়ে অস্ট্রো-
হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্য মুশকিলে পড়ে, এবং
সার্বিয়ার উপর যার পর নাই ক্ষুদ্ধ হয়। সার্বিয়া
একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কিন্তু অস্ট্রিয়া
একটি নিদৃষ্ট সময় বেঁধে দেয় প্রতিবেদন পেশ
করার জন্য এবং বিচারের কিছু শর্ত বেঁধে
দিয়ে তদন্ত কমিটিতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান
সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি নিয়োগের দাবী
জানায়। কিন্তু সার্বিয়া এর সব শর্ত মানতে
অস্বীকার করে।
তখন জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় উইলহেইম
অস্ট্রিয়াকে সম্পুর্ন সমর্থন দেবার ঘোষনা দেয়
এবং অস্ট্রিয়ান দাবীর সাথে সহমত পোষন
করে।আক্রমানাত্মক পদক্ষেপ নেবার জন্য
জার্মান সমর্থন অস্ট্রিয়ার জন্য ব্যাপক
প্রয়োজনীয় ছিল, কিন্তু জার্মানী-অস্ট্রিয়ার
এই যৌথ শক্তি'র উত্থানের বিপক্ষে জার্মানীর
২ প্রতিবেশী ফ্রান্স এবং রাশিয়া সার্বিয়ার
পেছনে এসে দাড়ায়।
এবং অস্ট্রিয়ার দ্বারা সার্বিয়া আক্রমনের
পরপর ভিন্ন ভিন্ন চুক্তি অনুসারে জার্মানী-
অস্ট্রিয়ার সাথে ফ্রান্স- রাশিয়া যুদ্ধে
জড়িয়ে পড়ে।
এবং অন্য একটি জার্মান-অটোমান চুক্তি
অনুযায়ী রাশিয়া যুদ্ধে যোগ দিলে অটোমান
সাম্রাজ্য জার্মানীর পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়ার
কথা ছিল, তাই অটোমান সাম্রাজ্যও যুদ্ধে যোগ
দেয়!
জার্মানী নিরপেক্ষ বেলজিয়াম আক্রমন করলে
তখন পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটেন জার্মানীর
বিপক্ষে যুদ্ধে ঘোষনা করে! ১৯১৭ সালে
রাশিয়ায় বলশেভিক ( কম্যুনিস্ট) বিপ্লবের ফলে
রাশিয়া যুদ্ধ ত্যাগ করে।আবার, মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং ভৌগলিক ও
সামরিক শক্তি ব্যাপক থাকলেও তাদের নীতি
ছিল (যেমন ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও)
যেকোন ইউরোপীয়ান ঝামেলার বাইরে
থাকা।
কিন্তু ফ্রান্স-ব্রিটেনকে রসদ যোগান দেয়ার
অভিযোগে জার্মান সাবমেরিন যখন ৭টি
যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ ডুবিয়ে দেয় তখন
যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত যুদ্ধে যোগ দিয়ে এটাকে
বিশ্বযুদ্ধ রূপ দেয়! এবং মুলত এরপরই জার্মান পরাজয়
নিশ্চিত হয়!
.
.
.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধঃ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানীকে ২৬৯
বিলিয়ন "গোল্ড মার্ক" জরিমানা করা হয় এবং
১৮৭২ এর যুদ্ধে জার্মান দখলকৃত "আলসাক-লরেন"
এলাকা ফ্রান্স নিয়ে নেয়! জার্মানীকে
অস্ত্রহীন করে ফেলা হয়। এবং অস্ট্রো-হাঙ্গের
ীয়ান সাম্রাজ্যকে একদম খন্ড খন্ড করে ফেলা
হয়।
অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তর আফ্রিকা এবং
মধ্যপ্রাচ্য বেদখল করা হয় এবং তুরস্কের নানা
অংশ দখল করার লক্ষ্যে ব্রিটেন-ফ্রান্স-ইটালী-
গ্রিস তুর্কী ভুখন্ডে ঢুকে যায় ( যদিও কামাল
আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্ক নিজেদের ভুমি
রক্ষা করতে সক্ষম হয় )।
সবচেয়ে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে , যুদ্ধ পরবর্তী
মূল নেতা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসনের
সাথে! মার্কিন নেতৃত্বে পুরো দুনিয়া বদলে
দেবার স্বপ্ন দেখিয়ে ইউরোপ থেকে দেশে
ফেরার পর মার্কিন কংগ্রেস উইলসনের সমস্ত
প্ল্যান খারিজ করে দেয়, এবং নিজেদের
ইউরোপীয়ান ঝামেলা থেকে দুরে রাখার
সিদ্ধান্ত নেয়!!!!! ( যেটা নতুন বিশ্ব ব্যাবস্থা
সফল করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে যায় )
এই অবস্থায়, ১০ বছর পেরিয়ে যায়। তখনো বিশ্ব
জুড়ে ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চ সাম্রাজ্য ছিল এবং
নিদৃষ্ট যোগ্য কোন নেতৃত্ব না থাকায় দেশগুলো
নব্য লিবেরাল আইডিয়া ঠিক মত আত্মস্থ করতে
ব্যার্থ হওয়ায়, ফলে "লীগ অব নেশন" কার্যত কাজ
করতে পারছিল না! এবং রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ
স্বার্থ রক্ষা করার নীতি এবং সামগ্রিক
চিন্তার অভাবে ধীরে ধীরে এটা পুরোপুরি
অকার্যকর হয়ে পড়ে
এই অবস্থায়, বিজয়ী ব্রিটেন বা ফ্রান্স
আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রনে অনাগ্রহী
হয়ে নিজ নিজ হিসাব ঠিক রাখায় ব্যাস্ত হয়ে
পড়ে। ফ্রান্সের লক্ষ্যে ছিল জার্মানীর
ভবিষ্যত যুদ্ধ করার ক্ষমতা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্হ করে
ফেলতে, কিন্তু ব্রিটেন হয়তো "নেপোলিয়ান"
যুগের কথা স্বরন করে "ব্যালেন্স অব পাওয়ার"
ঠিক রাখার জন্যই জার্মানীর সামরিক
উপস্থিতির সমর্থন করে! এবং জার্মানী আবার
নিজেদের সামরিক বাহিনী গঠনের অনুমুতি
পায়! ( এটা একটা মহা গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ
ঘটনা, কারন ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানীর
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ
উন্মুক্ত হয় এর দ্বারাই)
এরই মাঝে বিশ্বজুড়ে দেখা দেয় "অর্থনৈতিক
মহামন্দা" ( বর্তমান সময়ের মতই অবস্থা! ) করুন
অর্থনৈতিক পরিবেশে ইটালীতে ফ্যাসিস্ট
মুসলিনির আবির্ভাব ঘটে এবং জার্মানীতে
নির্বাচিত হয়ে যায় এডলফ হিটলার!!!
অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলায় সব দেশই নিজ নিজ
স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল এবং
চিরসত্য হলো, সামাজিক-অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খল
পরিবেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির চেয়ে
স্বৈরাচারী শাষন বেশী কার্যকর। তাই ফ্রান্স-
ব্রিটেনের তুলনায় জার্মানী-ইটালী'র
অর্থনীতি দ্রুত সংগঠিত হচ্ছিল!
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম পক্ষ, তুর্কী এইবার
নিজেদের বেশ কৌশলে যুদ্ধ থেকে দুরে
রাখে। যদিও তুর্কি জনগণ জার্মানদের প্রতি
সহানুভুতিশীল ছিল, কিন্তু তুর্কি সরকার মিত্র
বাহিনীর সাথে মিত্রতা রক্ষা করে চলে
পুরো সময়জুড়ে!
এবং এশিয়ার শক্তি জাপানও যখন ফ্যাসিস্ট
নীতি গ্রহন করে তখন, জার্মানী-ইটালী ও
জাপান ৩টি দেশ মিলে সারা বিশ্বে
তৎকালীন আর্থ-সামাজিক ব্যাবস্থা বদলে
"জাতিভিত্তিক" নতুন ব্যাবস্থা প্রণোয়নের
পরিকল্পনা গ্রহন করে।
এবং সেই লক্ষে কাজ করা শুরু করে দেয় শীঘ্রই।
পরবর্তী ইতিহাস বেশ সহজ!
ফ্যাসিস্ট ইটালি এবং জার্মানীর সাথে প্রথম
বিশ্বযুদ্ধে আংশিক জয়ী জাপানও সামরিক
বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধি পেয়ে ফ্যাসিস্ট
রিজিম কায়েম হয়!
এবং এই ৩ দেশ তৎকালীন আন্তর্জাতিক
রাজনৈতিক ধারা পরিবর্তনের পরিকল্পনা
করে। ওদের দাবী ছিল, তৎকালীন ব্যাবস্থা
সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন এবং ফ্রান্সেরই
সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করছে, অন্যদের
ঠকাচ্ছে ঐ ব্যাবস্থা!
প্রথম আগ্রাসী হয় জাপান, ১৯৩১ সালে চীনের
মাঞ্চুরিয়া, ১৯৩৭ সালে চীনের মুল ভুখন্ড দখল
করে।
ইটালী ১৯৩৫ সালে আবিসিনিয়া এবং ১৯৩৯
আলবানিয়া দখল করে।
এবার এ্যাকশন শুরু করে হিটলার! তারও স্বপ্ন ছিল
তৎকালীন বিশ্বব্যাবস্থা বদলে দিয়ে একটি
জাতিভিত্তিক ব্যাবস্থা প্রনোয়ন করা। তার
মতে তৎকালীন ব্যাবস্থা বদলে জার্মান
জাতির সন্মান পুনরুদ্ধার এবং শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত
করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়!
১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়াকে জার্মানীর সাথে
একীভুত করা হয়। ( যদিও অস্ট্রিয়ানরা বলে
হিটলার এমনটা জোর করে করেছিল , কিন্তু
আমার মনে হয় ঘটনা ভিন্ন )
১৯৩৯ সালে চেকোস্লোভাকিয়ায় বসবাসরত
জার্মানদের নিরাপত্তার অজুহাতে
চেকোস্লোভাকিয়া দখল করে ফেলে!
ব্রিটেন এবং ফ্রান্স ততদিনে ভবিষ্যৎ নিয়ে
চিন্তিত হতে শুরু করেছে। কিন্তু জার্মান
শক্তির কথা মাথায় রেখে ধৈর্য্য ধরে
পর্যবেক্ষন করে যাচ্ছিল এবং নাৎসিদের চেক
দখল পর্যন্ত মেনে নিয়েছিল।
কিন্তু নাৎসীদের পরবর্তী সম্ভাব্য শিকার
পোল্যান্ডের উপর নজর রাখছিল! ২৩ আগস্ট ১৯৩৯
সালে দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়ে নাৎসি
হিটলারের সাথে রাশিয়ার কম্যুনিস্ট নেতা
স্ট্যালিন একটি অনাগ্রাসন চুক্তি সম্পন্ন করে!
রাশিয়ার সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যাবার পর ব্রিটেন
এবং ফ্রান্স এখন কিছুই করার ক্ষমতা রাখে না
চিন্তা করে জার্মানী একসপ্তাহ পরই ১লা
সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমন করে!
কিন্তু নাৎসীদের অবাক করে দিয়ে,
পোলিশদের পাশে দাড়ায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স
এবং তারা জার্মানীর বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষনা
করে দেয়!
হিটলার দ্রুতই প্রচন্ড শক্তিশালী জার্মান
সেনাবাহিনীকে বলকান অঞ্চল, উত্তর
আফ্রিকা এবং পশ্চিম ইউরোপ অভিমুখে যাত্রা
করায়। তারা নরওয়ে, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম,
লুক্সেমবার্গ, হল্যান্ড দখল করে নেয়। ফ্রেঞ্চ-
ব্রিটিশ সব প্রতিরোধ উড়ে যায়! ১৯৪০ সালেই
জুলাই মাসের মধ্যে প্যারিস পর্যন্ত দখল করে
ফেলে নাৎসি জার্মানী! এবং ব্রিটেনের
উপর ভয়াবহ বিমান হামলা চালায়!
এরপরই ঘটে অদ্ভুদ সেই ভুল! কোন এক অজানা
কারনে ব্রিটেন সম্পুর্ণ দখল না করেই সদ্য মিত্র
রাশিয়া আক্রমন করে বসে! ( একই ভুল প্রথম
বিশ্বযুদ্ধে করেছিল করেছিল জার্মান কাইজার
দ্বিতীয় উইলহেইম )
এরপর অপেক্ষা করছিল তারচেয়ে বড় ভুল! জাপান
পার্ল হার্বারে তখন পর্যন্ত যুদ্ধের বাইরে
থাকা মার্কিন ঘাটি আক্রমন করে বসে!
( একই ভুল এর আগে করেছিল জার্মানি মার্কিন
জাহাজ ডুবিয়ে)
এবং একই সময়ে জার্মানীও যুক্তরাষ্ট্রের
বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষনা করে!
জাপানী আক্রমন এবং জার্মান যুদ্ধ ঘোষনার
প্রেক্ষিতে একঘরে নীতি বাদ দিয়ে মার্কিন
প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট ব্রিটেন ও
সোভিয়েত বাহিনীর সাথে মিত্রতা করে
যুদ্ধে যোগ দেয়!
এরপর আরো ৪ বছর জার্মানী চতুর্দিকে ছড়িয়ে
পড়া ফ্রন্টে যুদ্ধ করে যায় এবং কনসান্ট্রেশন
ক্যাম্পে ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ হত্যা করে!
রাশিয়ায় ব্যাপক সৈন্য হারিয়ে এবং মিত্র
বাহিনীর বিমানহামলায় জার্মানীর অভ্যন্তর
বিদ্ধস্ত হয়ে ব্যাপক শক্তি হারিয়ে এক পর্যায়ে
১৯৪৫ সালে আত্মসমর্পন করে!
এরপর পরাজয়ের দাড়প্রান্তে দাড়িয়ে থাকা
জাপান সাধ্যমত লড়ে যাচ্ছিল কিন্তু
জার্মানীর আত্মসমর্পনের ৩ মাস পর হিরোশিমা
ও নাগাসাকির ২ টা এ্যাটম বোমার বিস্ফোরন
তাদেরও আত্মসমার্পন তড়ান্বিত করে!
.
এই দুইটা বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস ঘেটে আমরা
নিম্নে উল্লিখিত কিছু ধারণা পাই।
১। প্রতিটা বিশ্বযুদ্ধ শুরু করার জন্যেই পিছনেই
কারণ হচ্ছে বিশ্বের একচ্ছত্র আধিপত্য হস্তগত
করা।
২। প্রতিটা বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে
'বাইলেটারাল ওয়ার' হিসেবে আত্নপ্রকাশ
করে। কিন্তু, পরবর্তীতে সেটা 'চেইন অব ওয়ার'
এ পরিণত হয়। অর্থাৎ, এক দেশ আরেকদেশের
সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ থাকা অবস্থায় কোন
একটা দেশ আক্রমণের শিকার হয়, ফলে অপর দেশ
অনাকাংখিতভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ঠিক
যেমন, কান টানলে মাথা আসে।
৩। প্রতিটা বিশ্বযুদ্ধই প্রথম দিকে বড় শক্তিধর
দেশগুলো কর্তৃক ছোট ছোট কিন্তু সম্পদশালী
দেশগুলোতে আক্রমণ ও দখলের ঘটনা আছে। কিন্তু,
সেখান থেকে চেইন অব ওয়ার এর কারণে অপর
দেশের অংশগ্রহণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। যার
ফলে যুদ্ধের সীমানা বাড়তে বাড়তে
বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়।
তাহলে আমরা বলতে পারি, একটা বিশ্বযুদ্ধ
সৃষ্টির পর্যায় (period) কিংবা, ধাপ (Step) চারটি।
যথা:-
ধাপ ১। বিশ্বজুড়ে একাধিক দেশের একচ্ছত্র
আধিপত্য বিস্তার করার আকাংক্ষা ও সেই
লক্ষ্যে শক্তি অর্জন।
ধাপ ২।অর্জিত শক্তি প্রদর্শনের জন্য কোন এক বা
একাধিক দেশ আক্রমণ করা
ধাপ ৩। অপর আধিপত্যবাদী শক্তি কর্তৃক প্রতি
আক্রমণ।(হয় অপর শক্তির উথানের শংকায় অথবা,
চেইন অব ওয়ার এর কারণে)
ধাপ ৪। আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ 'চেইন অব ওয়ার' এর
মাধ্যমে বাড়তে থাকা ও সমগ্র বিশ্বে (প্রায়)
ছড়িয়ে পড়া।
বলা বাহুল্য যে, আমরা কেবল চতুর্থ ধাপেই বুঝতে
পারি যে, একটা বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। (কিন্তু
ইসলামিক এস্কাটলজির ছাত্ররা এর আগেই বুঝে
যাব ইনশাআল্লাহ)।
এখন, এই কন্ডিশনগুলোর আলোকে আলোচনা করব
আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোন ধাপে আছি।
.
আমরা দেখতে পাচ্ছি,
১ম ধাপঃআমেরিকা বিশ্বে একক আধিপত্য
বিস্তার করতে চাচ্ছে। তার প্রকাশ্য বাধা
রাশিয়া। আবার, রাশিয়াও বিশ্বে একক
আধিপত্য বিস্তারের স্বপ্ন দেখে। আর, তার
প্রকাশ্য বাধা আমেরিকা। অপরদিকে, ইসরাইলও
বিশ্বে একক আধিপত্য বিস্তার করতে চাচ্ছে।
কিছুটা অন্য কায়দায়।
২য় ধাপঃ ছোট ছোট কিন্তু সম্পদশালী দেশ
আক্রমণ ও দখল নেয়া।আমরা দেখতে পাচ্ছি,
আমেরিকা তেলসমৃদ্ধ ইরাক ও আফগানিস্তান
দখল করেছে।
৩য় ধাপঃ আমেরিকার পরবর্তী শিকার ছিল
ইউক্রেন (যাতে রাশিয়াকে কোনঠাসা করা
যায়)। কিন্তু, বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে
রাশিয়া ইউক্রেনের (ক্রিমিয়া) দখল অর্জন
করে। আমেরিকার পরবর্তী প্রচেষ্টা সিরিয়া
দখল করা। কিন্তু, সেখানে তার প্রধান প্রতিপক্ষ
এখন রাশিয়া।এখন, রাশিয়া ও আমেরিকা দুই
গ্রুপই সিরিয়ার দখল নিয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে
যাচ্ছে।
এই তিনটি ধাপ সম্পন্ন হয়ে গেছ)
৪র্থ ধাপঃ এই ধাপ নিয়ে সবাই একমত নাও হতে
পারেন (আমি নিজেও জানি না আমার
ভবিষ্যত ধারণা সঠিক হবে কি না। যেটা
একমাত্র আল্লাহই জানেন)। তবু বলছি, একটু মনযোগ
দিয়ে খেয়াল করুন। হাদিসের মাধ্যমে আমরা
পূর্বাভাস পাই যে, মালহামা শুরু হবে সিরিয়া
থেকে (ফোরাত উপকূল থেকে)। সাম্প্রতিক তথ্য
অনুযায়ী, সিরিয়া তে তুরস্ক অভিযান
পরিচালনা করছে। কিন্তু, সিরিয়ার সাথে
তুরস্কের কুটনৈতিক সম্পর্ক কিন্তু ভালো নয়। তাই,
তুরস্কের এই পদক্ষেপের ফলে যেকোন সময় তুরস্ক-
সিরিয়া যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। যার ফল হবে
মালহামা বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কারণ, তুরস্ক হচ্ছে
ন্যাটোর সদস্য। অন্যদিকে, সিরিয়া হচ্ছে
'সিরিয়া-ইরান-রাশিয়া এলায়েন্স' এর সদস্য।
কাজেই এই দুয়ের মধ্যকার যুদ্ধ চেইন অব ওয়ার এর
মাধ্যমে দিতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের
আনুষ্ঠানিক রূপ।(আল্লাহ ভালো জানেন)