ইসলামের পথ থেকে সরে এসে যে তরুণটি বিভিন্ন ইসলাম বিরোধী কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছে তাকে আপনি শয়তানের দোসর ভাবতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি আপনার চিন্তাকে আরেকটু প্রসারিত করেন তাহলে এও হতে পারে যে তরুণটি ইসলামের কথা সঠিক ভাবে শোনেনি, ঈমানের পথে এমন কোনও সারথি সে এখনও পায়নি যে তাকে সেই সৌন্দর্যের সন্ধান দেবে যার সন্ধান আপনি পেয়েছেন। আপনি নিজেই কেন সেই সারথি হবার কথা চিন্তা করছেন না? আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপট তো আপনার অজানা নয়, এইটুকু উপসংহারে পৌঁছানো কি আপনার জন্য খুব কঠিন?
আপনি আপনার বিবেককে জিজ্ঞেস করুন - যেদিন আপনি আল্লাহ্র সামনে দাঁড়াবেন সেদিন আল্লাহ্কে আপনি কী বলে খুশি করাটা যৌক্তিক মনে করবেন? "আমি আপনার জন্য মানুষকে ইসলামের মেসেজ দিয়েছি হিকমাহ্ ও সুন্দর বক্তব্যের মাধ্যমে" নাকি "আমি আপনার জন্য গুপ্তহত্যা করে বা গুপ্তহত্যাকে সমর্থন দিয়ে ইসলাম কায়েম করে এসেছি।"
আপনি আপনার বিবেককে জিজ্ঞেস করুন - যেদিন আপনি আল্লাহ্র সামনে দাঁড়াবেন সেদিন আল্লাহ্কে আপনি কী বলে খুশি করাটা যৌক্তিক মনে করবেন? "আমি আপনার জন্য মানুষকে ইসলামের মেসেজ দিয়েছি হিকমাহ্ ও সুন্দর বক্তব্যের মাধ্যমে" নাকি "আমি আপনার জন্য গুপ্তহত্যা করে বা গুপ্তহত্যাকে সমর্থন দিয়ে ইসলাম কায়েম করে এসেছি।"
এই হত্যাকান্ডগুলো কারা ঘটাচ্ছে আসুন সেই রাজনৈতিক বিতর্কে আমরা নাহয় নাই জড়ালাম। যেহেতু ধর্মীয়-রাজনৈতিক ধুম্রজাল অত্যন্ত বিস্তৃত তাই আমরা সবাইকে বেনিফিট অফ ডাউট দিই। কে এই কাজ করেছে এই ব্যাপারে আমরা কথাই না বলি।
কিন্তু আমরা মুসলিমরা কি এই হত্যাকান্ডগুলোকে সমর্থন করবো? এই দায়ে যে যাদের হত্যা করা হচ্ছে তারা এমন কিছু কাজে জড়িত যা ইসলাম সমর্থন করে না? এবং এই হত্যাকান্ডগুলোকে সমর্থন না করার মানেই কি এই দাঁড়াবে যে আমরা ঐ অনৈসলামিক কাজগুলোকেও সমর্থন করি? নাকি আমরা বড় পরিসরে ব্যাপারগুলোকে যাচাই করে দেখার দিকে আহ্বান করছি কেবল?
এটা তো আমাদের অজানা নয় যে বহুদিন হয়ে গেল আমাদের দেশ কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশ মাত্র, এখানে ইসলামকে সামষ্টিক ভাবে বোঝার চর্চা এখনও খুবই সীমিত। এবং এটা কেবল আজকের কথা নয়, বহু দশক হয়ে গেছে আমরা একটি টোকেন ইসলামের চর্চা করে আসছি। এরকম একটি পরিবেশে সেক্যুলার চিন্তাভাবনা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার যে মডার্নিস্ট ব্যাখ্যা - যা পুরো বিশ্বে প্রধানতম আদর্শের স্থান নিয়ে নিয়েছে - এখানেও যে তা আস্তে আস্তে শিক্ষিত সমাজের প্রধান আদর্শিক অবস্থানে রূপ নিয়েছে তাতে আমাদের খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু অবাক হয়ে ওঠার তো কিছু নেই। বহুদিন ধরে ইসলামের আদর্শিক সত্যকে বুদ্ধিবৃত্তিক লেভেলে তুলে ধরার মতো কিছুই তো আমরা করতে পারিনি। সেরকম ইন্সটিটিউশন, ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানের চর্চা আমরা যারা ইসলামের ঝান্ডা বহন করি তারা তো গড়ে তুলতে পারিনি - এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় কী আমাদের আছে নাকি এটা স্বীকার করার মতো সৎ সাহস এবং বাস্তব জ্ঞানও আমাদের হয়ে ওঠেনি?
নবীজী (সা.) তার সময়ে যা কিছু করেছেন তার কোনোটিই অবু দশ বিশ ত্রিশ গুনে করা হয়নি। তেমনটি দাবী করা হলে সেটা হবে আল্লাহ্ ও তার রাসূলের (সা.) প্রতিই মিথ্যাচার। তার দা'ওয়াত ও তার জিহাদের প্রতিটি ঘটনাই ছিলো হিকমাহ্ বা প্রজ্ঞা অবলম্বন করে। এখন কারও কারও মনে হচ্ছে হিকমতের নাম নিয়ে সব কিছুকে জলবৎ তরলং করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি ধর্মীয় ইস্যুর পেছনে হিকমাহ্ থাকাটা যে নবীজীর (সা.) সুন্নাহ তা আপনি কীভাবে অস্বীকার করেন? আল্লাহ্র একটি নাম যে আল-হাকীম তা কীভাবে অস্বীকার করবেন? হিকমাহ্ শব্দটি যে কুরআনের একটি দর্শন সেটি কীভাবে অস্বীকার করা হবে?
ইবনুল কায়্যিম, ত্রয়োদশ শতাব্দির একজন শ্রেষ্ঠ 'আলেম, বলেছেন হিকমাহ হচ্ছে সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি সঠিক পদ্ধতিতে করা। কখনই হিকমার এই অর্থ করা হয়নি যে নবীজীর (সা.) সীরাতের কোনও একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে স্থান কাল পাত্রের হিসেব না করেই প্রমাণ হিসেবে বর্তমান সময়ে প্রয়োগ করে দেয়া হবে। ইবনুল কায়্যিম যে কথাটি বলেছেন সেটি খেয়াল করুন। আপনার সত্যিই কী মনে হয় যে আমরা সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি সঠিক পদ্ধতিতে করছি? নাকি আমরা এতটাই দাম্ভিক ও স্বধার্মিকতায় এতটাই মোহিত যে এই প্রশ্ন নিজেদের কিছুক্ষণ সময় নিয়ে করার মতো মানসিকতাও আমরা হারিয়ে ফেলেছি?
ইসলামের স্বার্থেই আসুন আমরা এই হত্যাকান্ডগুলোর বিরোধিতা করি। এইজন্য নয় যে আমরা কোনও ইসলাম বিরোধী কাজকে সমর্থন করি। এজন্যই যে আমরা মনে করি আমাদের স্থান ও কালে আমাদের মূল চ্যালেঞ্জটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিক। আমাদের ইসলামের সৌন্দর্যকে এর জ্ঞানের আলোকে তুলে ধরতে হবে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে যেসব মানুষ ইসলামের ব্যাপারে একটি প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছে তাদের কাছে ইসলামের মূল মেসেজ আমাদের তুলে ধরা হয়নি। ইসলামের মেসেজকে তুলে ধরার জন্য আমাদের বহু কাঠখড় পোড়াতে হবে এবং শক্তিশালী ইসলামিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে হবে। ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে ইসলাম কায়েম হবে না, কেবল ত্রাস কায়েম হবে।
আসুন হিকমাহ্ অবলম্বন করি। সংকীর্ণমনারা এই হিকমাহ্ বা প্রজ্ঞা অবলম্বন করাকে যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দেখুক না কেন হিকমাহ্ বা প্রজ্ঞা দিয়ে ইসলাম করা ও ইসলামকে মানুষের কাছে নিয়ে আসা আল্লাহ্ প্রদত্ত একটি মৌলিক দায়িত্ব। বাংলাদেশে ইসলাম পছন্দ করে না এমন অনেক কাজকে আমরা ধৈর্য ধরে সহ্য করেছি এবং আমরা আমাদের ইসলামিক জ্ঞান দিয়ে হোক অথবা সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে হোক - বুঝতে শিখেছি যে সত্যিকারের ইসলামকে তুলে ধরার জন্য আমাদের সত্যিকারের প্রজ্ঞা ও সত্যিকারের ধৈর্য লাগবে।
আবারও বলছি এই হত্যাকান্ডগুলোর দায় আমি কারও ওপর চাপাচ্ছি না। আল্লাহ্ই ভালো জানেন এগুলো কার করা। কিন্তু আসুন কাকে হত্যা করা হয়েছে সেদিকে আলোচনাকে প্রবাহিত করে এটিকে ইসলামের নামে জায়েজ না করে বরং আমরা ইসলামের মূল মেসেজকে ক্ষুণ্ণ করছে এমন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরোধিতা করি। আপনি সেই দেশে বাস করছেন যেই দেশে মানুষ ইসলামের নামে শিরকও করে থাকে, এতে আপনার সহিষ্ণুতা ধরে রাখতে একদমই কষ্ট হচ্ছে না। একই ধরণের সহিষ্ণুতা আবারও ধরে রেখে আমরা এধরণের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অনৈসলামিকতাকে স্পষ্ট করে তুলি। ইসলামকে ভালোবাসি বলেই, ইসলামের খাতিরেই, ইসলামের ভালো চেয়েই।
ইসলামের পথ থেকে সরে এসে যে তরুণটি বিভিন্ন ইসলাম বিরোধী কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছে তাকে আপনি শয়তানের দোসর ভাবতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি আপনার চিন্তাকে আরেকটু প্রসারিত করেন তাহলে এও হতে পারে যে তরুণটি ইসলামের কথা সঠিক ভাবে শোনেনি, ঈমানের পথে এমন কোনও সারথি সে এখনও পায়নি যে তাকে সেই সৌন্দর্যের সন্ধান দেবে যার সন্ধান আপনি পেয়েছেন। আপনি নিজেই কেন সেই সারথি হবার কথা চিন্তা করছেন না? আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপট তো আপনার অজানা নয়, এইটুকু উপসংহারে পৌঁছানো কি আপনার জন্য খুব কঠিন?
আপনি আপনার বিবেককে জিজ্ঞেস করুন - যেদিন আপনি আল্লাহ্র সামনে দাঁড়াবেন সেদিন আল্লাহ্কে আপনি কী বলে খুশি করাটা যৌক্তিক মনে করবেন? "আমি আপনার জন্য মানুষকে ইসলামের মেসেজ দিয়েছি হিকমাহ্ ও সুন্দর বক্তব্যের মাধ্যমে" নাকি "আমি আপনার জন্য গুপ্তহত্যা করে বা গুপ্তহত্যাকে সমর্থন দিয়ে ইসলাম কায়েম করে এসেছি।"
আমার এই আলোচনাটির জন্য বেধড়ক গালিগালাজ খেতে হবে যথারীতি। কিন্তু যেসব সাধারণ মুসলিমরা তাদের সাধারণ প্রজ্ঞা ও ইসলামের সামষ্টিক সৌন্দর্যকে মনে ধারণ করে আছেন তারা যদি নিজেদের সঠিক চিন্তার পেছনে আরেকটু মানসিক বল পান এবং এ নিয়ে নির্ভয়ে কথা বলার আরেকটু সাহস খুঁজে পান তাহলেই হবে। ইসলামকে এগিয়ে নেবেন এরাই - কুচক্রী ও নিন্দুকদের সকল অশ্লীল বক্তব্যকে অগ্রাহ্য করেই। অবিবেচক রক্তপাত ঘটানো কোনও কাজ না - প্রজ্ঞা ও বুদ্ধির মাধ্যমে যে ধর্মীয় অনুশীলন সেটাই মূল কাজ - ইসলাম বলতে সেটাকেই বোঝায়।
No comments:
Post a Comment